
বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রের স্বঘোষিত “শীর্ষস্থানীয় পরিচালক” সৃজিত মুখোপাধ্যায় একাধিক সাক্ষাৎকারে সস্নেহে বলেছেন যে ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর প্রতীয়মান জনপ্রিয়তা তাঁকে বাধ্য করেছে ‘দ্বিতীয় পুরুষ’-কে এক প্রীতিপূর্ণ পরিবারের নবাগত সদস্যর রূপে দেখতে। যদি পারিবারিক প্রতিবেশের সঙ্গেই সমান্তরাল খুঁজতে হয়, তাহলে হয়তো দেখা যাবে যে ‘দ্বিতীয় পুরুষ’ হচ্ছে পরিবারের সেই চালিয়াত যুবক, যে নিজেকে যতটা ধূর্ত আর নিপুণ বলে মনে করে, আদতে সে ততটা নয়।
1993 সালে কলকাতার চায়নাটাউনে খোকা নামক এক কুখ্যাত তরুণ গুন্ডা একাধিক হত্যার এবং বেআইনি কৃতকর্ম চালানোর অভিযোগে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। এখন, পুলিশের অনুমান অনুযায়ী, কারাবাস থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চায়নাটাউনের এবং অপরাধজগতের অন্ধকার গলিতে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে খোকার। এই প্রত্যাবর্তনের রহস্য উদ্ঘাটন করার দায়িত্ব প্রদান করা হয় অভিজিৎ পাকড়াশিকে। মূল গল্প এই ইঁদুর-বেড়ালের খেলাকে এবং খোকাকে পাকড়াশির পাকড়াও করার চেষ্টাকে কেন্দ্র করেই অগ্রসর হয়। কাহিনীর বেশি অংশ ব্যক্ত করাটা উচিত হবে বলে মনে হয় না, আর এর অধিক কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় না।

যখন কেউ অঙ্ক কষতে বসে, তখন সে খুব সতর্ক হয়ে প্রতিটা পদক্ষেপ নিরূপণ করে, কারণ একটা পদক্ষেপ এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই অন্তিম ফল হবে লবডঙ্কা; একটি সার্থক থ্রিলারের চিত্রনাট্য রচনার প্রক্রিয়াতেও এই সূক্ষ্ম সুচিন্তিত নির্ভুলতার প্রয়োজন হয়, কারণ গল্পের মসৃণতায় একটা ছোট্টো গর্ত প্রকট হলেই বিপর্যয়। এই ক্ষেত্রে, চিত্রনাট্যকার সৃজিতবাবু বেশ কিছু গর্তের মেরামত করতে পারেননি। মনে একটা অক্রূর সরলতা নিয়ে উনি দর্শককে ছবিটা চামচ দিয়ে খাইয়ে দেন বটে, কিন্তু এই সরলতার সঙ্গী হয়ে আসে এই ধারণা যে আমরা স্পষ্টভাবে পরিবেশিত খাবারটা খাওয়াকালীন তাঁকে আর কোনো প্রশ্ন করবো না; কেন খাওয়াচ্ছেন, কোন উপকরণসমূহ দিয়ে তৈরি, যেমনটা স্বাদ হবে বলে মনে হয়েছিল তেমনটা নয় কেন, ইত্যাদি।
সংলাপও হতাশাজনক; যে ধারালো এবং চটপটে সংলাপের জন্য সৃজিতবাবু খ্যাত, সেই সংলাপগুলিকে আজ বড়োই কৃত্রিম মনে হয়। মনে হয় যেন কেবল সংলাপের পরিকল্পিত প্রতিক্রিয়ার (দর্শকের বাহবা ও হাততালির) কথা ভেবেই উনি উল্লসিত হয়ে লেখেন; মাঝে মাঝেই অনুভব করা যায় যে এখানে চলচ্চিত্রের প্রতি উদ্দীপনার চেয়ে বেশি প্রবল মুরুব্বিয়ানা।
1993-র খোকার ভূমিকায় ঋতব্রত মুখোপাধ্যায় ও বর্তমান কালের খোকার ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্য নজর কাড়বেন নিঃসন্দেহে। অনবদ্য অভিনয় দুজনেরই; তাঁদের চরিত্রের হিংস্রতাটাকে যেন অবলীলায় আপন করে নিয়েছেন তাঁরা। অভিজিতের ভূমিকায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় যথাযথ, এবং ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর ঘটনার পরবর্তীতে তাঁর চরিত্রের মানসিক পরিবর্তনকে তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। সহায়ক তদন্তকারী রজতের ভূমিকায় গৌরব চক্রবর্তী চলনসই। অভিজিতের স্ত্রী অমৃতার ভূমিকায় রাইমা সেন ও রজতের প্রেমিকার ভূমিকায় রিদ্ধিমা ঘোষ হতাশাজনক; চিত্রনাট্যও তাঁদের বিশেষ সুযোগ দেয়নি প্রতিভা প্রদর্শনের, এবং যেটুকু দেওয়া হয়েছে, সেটুকুর রসও নিংড়ে বের করতে পারেননি দুই অভিনেত্রী।
সৌমিক হালদারের চিত্রগ্রহণ বেশ কিছু ক্ষেত্রে চিত্তাকর্ষক, বিশেষ করে কয়েকটি পশ্চাদ্ধাবনের দৃশ্যে; কিছু জায়গায় একটু অপরিপক্কও বটে, কারণ আলোর ব্যবহার মাঝেমধ্যে বেমানান আর ক্যামেরার ছায়া মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান। গান ও নেপথ্যসঙ্গীত নিয়ে নালিশ করার কিছু নেই, এবং অনুপম রায়ের ‘যে কটা দিন- রিপ্রাইজ’ ছবির প্রসঙ্গে বেশ বলবৎ।

আরেকটু মনস্তাত্ত্বিক এবং ভাবগত স্তরে, ছবিটি কিছু অস্বস্তিকর বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হয় বটে, কিন্তু সেগুলো নিয়ে আলোচনাটা উপরিতলের বেশি নীচে নামে না। তবুও, একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছবির পরিসরে এবং বৃহত্তর সমাজব্যবস্থাতে প্রাসঙ্গিক: সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং হিংসাত্মক অপরাধীদের কী মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য, নাকি তাদেরও মানসিক পুনঃপ্রাপ্তির সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব? এই প্রশ্নের উত্তর ছবি প্রত্যক্ষভাবে দেয় না, কিন্তু আপনার মনে প্রশ্নটা একটি ছোটোখাটো স্থান দখল করলেও সেটা একটা কৃতিত্ব।
শেষমেশ, আপনাকে বলা দরকার যে যদি আপনি ছবির শেষ অঙ্কের ‘বিস্ফোরক’ উন্মোচনের জন্য দুই ঘন্টার অনুমেয় জাবর কাটা দেখতে রাজি থাকেন, তবে ছবিটি সানন্দে দেখুন। আগের ছবিটির ‘গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও’-এর বার্তা যদি রপ্ত করে ফেলে থাকেন, তাহলে অবশ্য ওই বিস্ফোরণের তেজ খুবই ক্ষণস্থায়ী হবে। আর, সৃজিতবাবুকে বলা দরকার যে ছবি বানাতে চাতুর্যবোধ আর নস্টালজিয়া ছাড়াও কয়েকটা জিনিসের প্রয়োজন হয়; সেগুলো নিয়ে আবার একটু নাড়াচাড়া করতে ক্ষতি কী?